Home » অ্যাডভেনচার ট্রাভেল » নৌকায় ভেসে সারা দেশ

নৌকায় ভেসে সারা দেশ

:: শাহরিয়ার পারভেজ ::

অভিযানের শুরুটা হয়েছিল ভ্রমণবিষয়ক ফেসবুক গ্রুপের একটি পোস্ট দেখে। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নৌপথে ভ্রমণের বিষয়টি নিয়ে কেউ একজন লিখেছিলেন। তিনি লাল দাগ টেনে ধারণা দিয়েছিলেন, ভারতের আসাম থেকে কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র নদ বাংলাদেশে প্রবেশ করে পদ্মা-মেঘনা হয়ে বঙ্গোপসাগরে নেমে গেছে।

এ পথ ধরে দেশের একদম ওপর থেকে একেবারে নিচের অংশ ছেঁড়াদ্বীপ পর্যন্ত যাওয়া যেতে পারে। আইডিয়াটা কেমন জানি বেশ মনে ধরে গেল। এরপর নিজে নিজে কিছু খোঁজ নিলাম। কোথা থেকে শুরু করা যায়, কোথায় কোন ঘাট, কোথায় স্থানীয় নৌকা আছে, কোথায় ওয়াটার বাস, কোথায় লঞ্চ, কোথায় রাতে থাকা যায়, কেমন সময় লাগতে পারে এই সব। এর মধ্যে মনে মনেই একজন ভ্রমণসঙ্গী খোঁজার চেষ্টায় ছিলাম। দুজনের একটা দল হলে মনে হলো বেশ কিছু ব্যাপারে সহায়তা পাওয়া যাবে।

পূর্ব অভিজ্ঞতা বলে, ব্যাক প্যাকিং ভ্রমণে দুজনের দল বেশ চমৎকার হয়। এরই মধ্যে পরিচয় হলো ইজাব নামের এক জুনিয়রের সঙ্গে, সদ্য কলেজ শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির চেষ্টা করছিলেন তিনি। আলাপ–পরিচয় হলো। বেশ আগ্রহ দেখালেন নৌপথে ভ্রমণ নিয়ে। এভাবে তৈরি হলো আমাদের দুজনের দল।

এর মধ্যেই রুট প্ল্যান করলাম কোথা থেকে শুরু, কোন কোন ঘাটে নামতে হবে, কোথায় রাত কাটাতে হবে, মোট কয় দিন লাগবে এসব হিসাব করে। হিসাবমতো ১৭ দিনে কুড়িগ্রামের চিলমারী থেকে শুরু করে ছেঁড়াদ্বীপে পৌঁছে যাওয়ার কথা। কিছু কেনাকাটা করলাম। আমার তাঁবু, স্লিপিং ব্যাগ বা অন্যান্য ক্যাম্পিং ও ব্যাকপ্যাকিং গিয়ার থাকলেও ইজাবের কিছুই ছিল না। সব কিনতে হলো। সঙ্গে লাইফ জ্যাকেট। এর মধ্যেই রানা ভাইয়ের কল্যাণে পুলিশের এক অতিরিক্ত ডিআইজির শুভেচ্ছাপত্র পেলাম। ক্রস কান্ট্রি রাইডজুড়েই আমরা ‘নদী বাঁচাও’ স্লোগান নিয়ে কথা বলেছি অনেক নদীকেন্দ্রিক মানুষের সঙ্গে আর কিছু স্কুলে। একই সঙ্গে নৌ পুলিশকে সহায়তা করার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টা করেছি।

যাত্রা হলো শুরু

২০১৭ সালের ডিসেম্বরের এক রাতে ঢাকা থেকে বাসে কুড়িগ্রামের চিলমারী পৌঁছাই। ভোর তখন ছয়টা। গন্তব্য রাজীবপুর ঘাট। স্থানীয় নৌকা ছাড়ার সময় দুপুর সাড়ে ১২টা। হাতে কয়েক ঘণ্টা সময় ছিল বলে চিলমারী ঘুরে দেখতে বের হলাম। কাছেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অ্যাসেম্বলি হচ্ছিল, দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীত শুনলাম বেশ কিছুক্ষণ। কেমন অসাধারণ একটা অনুভূতি হয়েছিল সেদিন।

আগ বাড়িয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বললাম। শিক্ষার্থীদের সঙ্গেও কথা হলো। নদীকে দূষণমুক্ত রাখা, প্লাস্টিক বর্জ্য না ফেলা ইত্যাদি নিয়ে কথা হলো।

এরপর দেখা হলো মুজিবর কাকার সঙ্গে। তিনি একজন মুদি দোকানি। সময় কাটানোর জন্য যখন ঘোরাঘুরি করছিলাম, তখন এই বয়স্ক হাস্যোজ্জ্বল লোক আমাদের ডাক দেন। অতি উৎসাহে জানতে চান আমরা কারা, কেন এসেছি, কী করি এসব। এরপর শুরু হলো আড্ডা। এলাকার অবস্থা, এলাকার শিক্ষা, তাঁর জীবনকাহিনি, মহান মুক্তিযুদ্ধের গল্প, তাঁর বিয়ের গল্প!

গল্প আর শেষ হয় না। কথায় কথায় জানলাম, তিনি একজন মুদি দোকানি হয়েও গাঁটের টাকা খরচ করে এলাকায় শীতবস্ত্র বিতরণ করেন। একসময় না চাইতেও বিদায় নিতে হলো। সহজ–সরল মানুষটির জন্য সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তৈরি হয়ে গেল এক দেখায়ই।

মুজিবর কাকার সঙ্গে দেখা করে রাজিবপুরে এসেছিলাম। রাজিবপুর থেকে গাইবান্ধার বালাসী ঘাটে পৌঁছাতে রাত হয়ে গেল। ঘাটে নেমে দেখি সব দোকান বন্ধ। শুধু মাঝির জন্য দুই প্লেট ভাত আর ঠান্ডায় জমে যাওয়া মাংস নিয়ে অপেক্ষা করছেন এক দোকানি। আকবর মাঝি যখন শুনলেন যে আমরা আজ নদীর পাড়েই অথবা ঘাটে তাঁবু করে থাকব এবং আমাদের সঙ্গে কোনো খাবার নেই, তখন তিনি অতি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। নিজের জন্য রাখা খাবার খেতে আমাদের বাধ্য করলেন। তাঁবুর বদলে রাতে তাঁর নৌকাতেই থাকতে বাধ্য বললেন।

আমাদের ভ্রমণের প্রথম রাত কাটল নৌকার ছইয়ে বসে চাঁদ আর কুয়াশা প্রকম্পিত করা আকবর মাঝির ভাটিয়ালি গান শুনে। এই লোক পরবর্তী প্রতিটি দিন ফোন করে আমাদের খবর নিয়েছেন। শহরে ফিরে এসব মানুষের কথা আমাদের মনে থাকে না। নানা ব্যস্ততায় এসব সরল চরিত্রকে আমরা ভুলে যাই, ভুলে যেতে বাধ্য হই।

নদীতে জল নেই

এরপর আমরা চলে গেলাম ফুডানিবাজার হয়ে, সাঘাটা দিয়ে সিরাজগঞ্জ। সেখান থেকে বগুড়ার সারিয়াকান্দি, টাঙ্গাইলের ভুয়াপুর হয়ে মানিকগঞ্জের আরিচা দিয়ে ঢাকায় ঢোকার কথা থাকলেও কোনো স্থানীয় নৌকা পাওয়া গেল না। কোনো মালবাহী নৌকাও নেই। যমুনা সেতু এবং শীতকাল মিলে নাব্যতা–সংকটে ধুঁকতে থাকা নদী তখন ধু ধু বালুচর, জায়গায় জায়গায় ছোটখাটো ট্রলারও আটকে যাচ্ছে এমন অবস্থা। এসবই স্থানীয় মাঝি ও নদীতে চলাচলকারী মানুষদের দেওয়া তথ্য। অনেক চেষ্টা করে যখন শুনলাম, রিজার্ভ নৌকা নিলে আরিচায় যাওয়া সম্ভব এবং খরচটা ১৪ হাজার, তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, যা হওয়ার হয়ে গেছে, কোনোভাবে ঢাকায় যাই, সেখান থেকে চাঁদপুর অন্তত এগোনো যাবে।

একটা বাধা যেহেতু চলেই এল, আর উপায়ন্তর না দেখে হতাশ হয়ে সড়কপথে ঢাকার দিকে রওনা দিলাম এই আশায় যে বাকি পথটুকু অন্তত শেষ করি। দেশের শুরু থেকে শেষ প্রান্তে যাওয়ার সাধ যখন জেগেছেই, তা পূরণের চেষ্টা করি, সদরঘাট থেকে আবার শুরু করি। প্রচুর জ্যাম আর ধুলাবালি ঠেলে অনেক সময় লাগিয়ে সদরঘাটে নামার সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল, মাত্র পাঁচ মিনিট আগে চাঁদপুরের শেষ লঞ্চটি ছেড়ে গেল। হাত বাড়িয়ে ধরা যাচ্ছে, এমন মনে হলেও তার আর উপায় নেই। সারা দিনের ধকল, পরিশ্রম, ক্ষুধা, হতাশা, ক্রোধ সব যেন এক মুহূর্তে নেমে এল। হতাশ হয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে রাতটা কাটালাম।

সকালে নতুন উদ্যমে শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়ে রাতে লঞ্চে চলে গেলাম চাঁদপুর। চাঁদপুরে আমরা দুই দিন থাকলাম। চাঁদপুর শহর, মোহনা, ডাকাতিয়া নদীর এ পার–ও পার ঘুরে দেখলাম। অপেক্ষা চলছিল সপ্তাহে তিন দিন ঢাকা থেকে হাতিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে আসা এমভি ফারহান অথবা পানামা লঞ্চের। তৃতীয় দিন পাত্তারি গুটিয়ে সন্ধ্যায় চাঁদপুর থেকে রওনা দিলাম ভোলার মনপুরার উদ্দেশে।

রাতে ছাদে উঠে গেলাম, আশ্রয় নিলাম লঞ্চের আপার ডেকে। রাত আড়াইটায় লঞ্চের ছাদে উঠে দেখি, বিশাল ছাদটা শিশিরে ভেজা, আকাশে হিরার মতো জ্বলজ্বলে একটা চাঁদ আর চারপাশে ঘন কুয়াশা। তখন তাপমাত্রা ১৬ কি ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, চাঁদের আলোয় ভেজা ছাদটা চকচক করছে। আমরা মেঘনার মধ্যিখানে ভাসছি, চারপাশে অথই পানি, ঝিকিমিকি পানি। ছাদে একটা বিশাল লাইফবোট ছিল, তার মধ্যে শুয়ে কিছুক্ষণ চাঁদ দেখলাম। প্রচণ্ড ঠান্ডায় ছাদেই তাঁবু পাতার চেষ্টা করে বিফল হয়ে স্লিপিং ব্যাগ খুলে দুজন শুয়ে পড়লাম। চাঁদ দেখতে দেখতে কখন ঘুমিয়ে পড়লাম জানি না। চোখ যখন খুলল, দেখি লাল টুকটুকে একটা সূর্য নারিকেল আর সুপারি গাছের ওপর বসে আছে।

হক সাহেবের সাক্ষাৎ

ভোলার মনপুরায় নেমে নাশতা সেরে রিকশা করে এ পাড়া-ও পাড়া বেড়িয়ে, ধানখেতে ছুটাছুটি করে তজুমদ্দিন ঘাটে গিয়ে দেখলাম, নোয়াখালীর হাতিয়া যাওয়ার ওয়াটার বাসটা ছেড়ে চলে গেছে। আবারও একটা ঝামেলা পাকিয়ে মন–মেজাজ খারাপ করে নানা উপায় খুঁজছি। সময়স্বল্পতার কারণে সাত–পাঁচ না ভেবে দুই হাজার টাকায় একটা স্পিডবোট ভাড়া করে পাতালিয়া চর, বদনার চর ঘুরে চলে গেলাম হাতিয়ায়। হাতিয়ায় নেমে আমাদের পরিচয় হলো আরেক বিচিত্র চরিত্র হক সাহেবের সঙ্গে।

হক সাহেব বাবার বড় ছেলে। রাজনীতি আর বন্ধুদের পাল্লায় ছোটবেলা আর যৌবন খুইয়েছেন, হয়নি পড়াশোনাও। জেল–জরিমানাও ভুগিয়েছে একসময়। এখন বয়স ৩২, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সংসার। রোজগারের জন্য এখন ভাড়ায় মোটরবাইক চালান। এই হলেন আমাদের হক সাহেব। হাতিয়ার নলচিড়া ঘাটে পরিচয়, অনেকটা রোবট ধরনের হক সাহেব নিজে থেকে কিছু বলেন না। কিছু জিজ্ঞেস করলে অল্প কথায় জবাব দেন।

হক সাহেবকে নিয়ে প্রথমে গেলাম জাহাজমারা ঘাটে। সেখান থেকে নৌকা করে গেলাম নিঝুম দ্বীপে। নিঝুম দ্বীপে অনেকেই হরিণ, বন দেখতে গেলেও আমরা সরাসরি সমুদ্রের পাড়ে চলে গেলাম। নিঝুম দ্বীপ থেকেই মূলত বঙ্গোপসাগরের সীমানার শুরু বলা যায়। দুপুর থেকে পুরো বিকেল নিঝুম দ্বীপের সমুদ্র সৈকতে দাপাদাপি করে, গান গেয়ে, নেচে, সূর্যাস্ত দেখে হাতিয়ায় ফিরে এলাম।

ফিরে দেখি হক সাহেব আমাদের অপেক্ষায় বসে আছেন। জাহাজমারা থেকে যখন বের হচ্ছি, তখন চারপাশে অন্ধকার, রাস্তাঘাটে দুই-চারজন মানুষ দেখা যাচ্ছিল। আমাদের উদ্দেশ্য জুতসই একটা জায়গা বুঝে তাঁবু ফেলা এবং সকালে নলচিরা থেকে বারো আউলিয়া শিপ ধরে চট্টগ্রামে চলে যাওয়া।

হক সাহেব আমাদের রাতের অন্ধকারে নানা চিপাচাপা দিয়ে, গাছের আর জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে নিয়ে যেতে যেতে শুধু একটি কথাই বারবার বললেন, ‘আপনাগরে তাঁবু-তুবুতে থাকতে দেওয়া যাইব না, আপনেরা আমার বাড়িতে চলেন।’ কোনোভাবেই তাঁকে বোঝাতে পারি না যে আমরা তাঁবুতেই থাকতে চাই, কাউকে ঝামেলায় ফেলা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। তবুও তাঁর একটাই কথা, ‘উঁহু, বাড়িতে চলেন।’

জোরাজুরি দেখে কেমন যেন সন্দেহ, ভয় দুটোই ভর করল। অনেক চিন্তাভাবনা করে, বুকে সাহস নিয়ে চলে গেলাম হক সাহেবের বাড়িতে। পরিচিত হলাম তাঁর ছোট ভাই-বোন আর মা-বাবার সঙ্গে। একচালা টিনের ঘরের একটা টেবিলে বসে ছোট ভাই এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। কিছুক্ষণ তাকে এই–সেই পড়ালাম, বোঝালাম, কথা বললাম। রাতে মাছ আর তিন রকম সবজি দিয়ে পেট পুরে ভাত খেলাম।

কিন্তু ঝামেলা শুরু হলো ঘুমানোর আয়োজন করতে গিয়ে। তিনি কোনোভাবেই তাঁবু ফেলতে দেবেন না। তাঁর এক কথা, ‘আমাগো বাড়ির মেহমান আপনেরা, বাইরে থাকলে মাইনষে কী কইব?’

অনেক দেন-দরবারের পর তিনি উঠানে তাঁবু ফেলার অনুমতি দিলেন। একটু পর দুইটা বালিশ আর একটা লেপ বগলদাবা করে এনে দিলেন। তাঁকে যতই বলি যে আমাদের স্লিপিং ব্যাগ আছে, এগুলো কিছুই লাগবে না, আমরা আরামে ঘুমাতে পারব, তবু তাঁকে বোঝাতে পারি না। এই বান্দা রাতে তিনবার ঘর থেকে বের হয়ে তাঁবুর কাছে এসে জানতে চেয়েছেন, শীত লাগে কি না, কাঁথ–কম্বল লাগবে কি না!

সকালে উঠে দেখি বারান্দায় হক সাহেব নেই, খেজুরের রসের সন্ধানে গেছেন। খোলা পিঠা দিয়ে নাশতা করে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গেলাম নলচিরা ঘাটে, হক সাহেব তখনো সঙ্গে ছিলেন।

পীড়াদায়ক পর্ব

হাতিয়া থেকে চট্টগ্রামের ভ্রমণটা একটু পীড়াদায়ক। আমরা সাধারণত ডেকে বা ছাদে বসেই পুরো ভ্রমণ সেরেছি। এই বেলা এমভি বারো আউলিয়া নামের বিআইডব্লিউটিসির বিশাল জাহাজটার ডেকে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা তপ্ত রোদে পুড়ে একটু অসুস্থ বোধ করছিলাম। তবে এ জাহাজের ডেকে বেশ আজব আড্ডার দেখা মেলে। কোথাও কেউ বাজনা বাজিয়ে গান গাইছেন, কেউ তাস পেটাচ্ছেন, এক দল আবার ধর্ম নিয়ে আলোচনায় মগ্ন, নারীদের এক দল কাঁথা সেলাই করছে ডেকে বসেই, সঙ্গে ফেরিওয়ালা, জাদুকর, বায়োস্কোপওয়ালার দেখাও মিলল।

চট্টগ্রাম নামতে নামতে বিকেল। এর মধ্যেই ইজাবের ডিহাইড্রেশন শুরু হলো, সঙ্গে মাইগ্রেন। সে রাতে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল, আর সামনে না এগোনোর। আমার একাই বাকিটা পথ পাড়ি দিতে হবে। ইজাবের ঢাকায় ফেরার সব ব্যবস্থা করে বেশ দেরি করে ঘুমালাম। ভোরে ফিশারি ঘাট থেকে কুতুবদিয়ার ট্রলার ধরতে হবে। ভোর সাড়ে পাঁচটায় চোখ খুলে দেখি ইজাব ব্যাগ গোছাচ্ছেন এবং তৈরি হয়েছে বের হওয়ার জন্য। আমাকে দেখে বললেন, ‘ভাই, আমি প্রস্তুত।’ সেই সকালে নতুন এক ইজাবকে দেখা গেল।

কুতুবদিয়ার ট্রলারটা একটু ব্যতিক্রমী। ঢাউস আকার, নিচে বিস্তর জায়গা, প্রচুর মাল উঠল তাতে আর ছাউনি দেওয়া জায়গাটার মধ্যে বর্ডার করা। এক পাশে নারী, আরেক পাশে পুরুষ বসা। ছাদে প্রচুর কলা, সবজি আর যাত্রী বোঝাই। কুতুবদিয়ার ওয়াটার বাসটায় বেশির ভাগই কুতুববাগী দরবার শরিফের উদ্দেশে ভেসে বেড়ানো যাত্রী।
কুতুবদিয়ায় নেমে আমরা বেশ কিছুক্ষণ টই টই করলাম। এ পাড়া–সে পাড়া ঘুরে, লবণের খেতে দৌড়াদৌড়ি করে আবার ইঞ্জিনচালিত এক লোকাল নৌকায় চলে গেলাম মহেশখালী।

মহেশখালী থেকে আবার সোনাদিয়া, সোনাদিয়া থেকে আবার মহেশখালী। একটু ঘুরে বেড়ানো, সমুদ্রের পাশের মানুষজন দেখা, নদী তথা সমুদ্রদূষণ নিয়ে দু-চারজনের সঙ্গে আড্ডার ছলে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করার মধ্যেই দিন চলে গেল।

সন্ধ্যা নামার আগে

সন্ধ্যার আগে আগে চলে গেলাম কক্সবাজারে। সেখানে নেমেই হলো বিপত্তি। এই প্রথম আমরা ক্যাম্পিংয়ের অনুমতি পেলাম না। আমাদের কাছে ডিআইজির সুপারিশপত্র থাকলেও তৎকালীন কক্সবাজার সুপার আমাদের কচ্ছপের বিচরণস্থলে তাঁবু ফেলতে দেবেন না বলে মানা করে দিলেন। একই সঙ্গে কক্সবাজার থেকে টেকনাফে নৌপথে যেতে কড়াভাবে মানা করে দিলেন নিরাপত্তার খাতিরে। কোস্ট গার্ডের সঙ্গে দেখা করে, স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে ধরনা দিয়ে কোনো লাভই হলো না। টানা ৩৬ ঘণ্টা চেষ্টার পর বিফল হয়ে সড়কপথে ১৩তম দিনে আমরা পৌঁছালাম টেকনাফে। সেখানে দেখা হয়ে গেল আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের আট বন্ধুর সঙ্গে।

শেষ বিকেলে ট্রলারে উথাল–পাথাল নাফ নদ আর বঙ্গোপসাগরের মিলনে দুলতে দুলতে সূর্যাস্ত দেখছিলাম, সবাই মিলে চিৎকার করে গাইছিলাম, ‘ওরে নীল দরিয়া, আমায় দে রে দে ছাড়িয়া।’ সন্ধ্যার অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গে আমরা সেন্ট মার্টিন পৌঁছালাম। ট্রলারের ভ্রমণ অনেকের জন্য ভীতিকর ছিল, সি-সিকনেসের কারণে অনেকে বমি করে একাকার। তারা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল সাড়ে তিন ঘণ্টা পর।

বাংলাদেশের উপকূলীয় জায়গাগুলো বা সমুদ্র সৈকতের দিক থেকে সেন্ট মার্টিন আমাকে বেশ মুগ্ধ করেছে। পরিচ্ছন্নতা, আবহাওয়া, স্থানীয় জেলেপাড়া—এসবের মধ্যে অন্য রকম একটা রোমাঞ্চকর অনুভূতি মাথায় কাজ করে। শেষ গন্তব্য বলেই হয়তো তিন রাত কাটিয়ে দিলাম সেন্ট মার্টিনে। ঘুরেফিরে, খেলেধুলে, খেয়েদেয়েই বেশির ভাগ সময় পার হলো।

দ্বিতীয় দিন দুপুরে দল বেঁধে গেলাম ছেঁড়াদ্বীপে। সারি সারি ডাব আর নারিকেল গাছের দিকে তাকিয়েই দুপুর পার করে বিকেলে ফিরে এলাম আবার সেন্ট মার্টিন দ্বীপে। সেখান থেকে পরদিন ঢাকার পথ ধরা।

শেষ কথা

এই ছিল আমার ঝোঁকের বশে একটা ছোটখাটো অভিযানের আদ্যোপান্ত। পুরো ভ্রমণে আমরা প্রায় ৮০০ কিলোমিটার নদীপথে এবং সড়কপথে প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার পথ ভ্রমণ করেছি। ১৯ দিনে খরচ হয়েছে ৮ হাজার ১০০ টাকা। যদি মনপুরা থেকে হাতিয়ায় স্পিড বোটে যেতে না হতো, তবে খরচ যে আরও কমে যেত, তা বলাই যায়।

এই ১৯ দিনের অর্জন কী, সেটা হয়তো গুছিয়ে বলা যাবে না, তবে নিজেকে একটু অন্যভাবে আবিষ্কার করেছি। নিজের ধৈর্য, সহ্যক্ষমতা ও শারীরিক শক্তি সম্পর্কে জেনেছি। ব্যাকপ্যাকিং ভ্রমণের মজাটাই এখানে। আর এই যে দেশের এক মাথা থেকে আরেক মাথায় ভেসে বেড়ানো, নদীগুলোকে দেখা, চেনা, নদীর পাড়ের মানুষগুলোকে নিয়ে ধারণা, তাদের সঙ্গে সখ্য—এই সবই অর্জন। সৌজন্যে: প্রথম আলো।