Home » রকমারি » বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে দুই ট্রান্সজেন্ডার
তাসনুভা আনান শিশির (বামে) ও নুসরাত মৌ (ডানে)৷

বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে দুই ট্রান্সজেন্ডার

Ôসমাজ, পরিবার সবকিছু উলটো পথে হাঁটছিল৷ সব প্রতিবন্ধকতা ভেদ করেই আজকের জায়গা তৈরি করতে হয়েছে৷’’ ডয়চে ভেলেকে বলছিলেন তাসনুভা আনান শিশির, বাংলাদেশে প্রথম টেলিভিশনে সংবাদ পাঠের সুযোগ পাওয়া ট্রান্সজেন্ডার নারী৷

বেসরকারি চ্যানেল বৈশাখী টেলিভিশনে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে সংবাদ পাঠ করবেন তিনি৷

একই দিন চ্যানেলটির একটি নাটকে দেখা যাবে আরেক ট্রান্সজেন্ডার নারী নুসরাত মৌ-কে৷ শুক্রবার সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বৈশাখী টেলিভিশন এই ঘোষণা দিয়েছে৷ চ্যানেলটির উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক টিপু আলম মিলন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমরা আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, বৈশাখী টেলিভিশন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর এই বছর, স্বাধীনতার মাস মার্চে নারী দিবস উদযাপনের আগে সংবাদ বিভাগ ও নাটকে দুই জন ট্রান্সজেন্ডার নারীকে যুক্ত করেছে৷ দেশের মানুষ এই প্রথম একজন ট্রান্সজেন্ডারকে পেশাদার সংবাদ বুলেটিনে পাঠ করতে দেখবেন৷’’

দৃষ্টান্ত স্থাপনের সেই মুহূর্তের জন্য দুইজনই এখন ভীষণ ব্যস্ত সময় পার করছেন৷ তার মধ্যেই ডয়চে ভেলের কাছে জানিয়েছেন তাদের বাধার পাহাড় ডিঙানোর গল্প৷

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার অব পাবলিক হেলথের শিক্ষার্থী তাসনুভা আনান শিশির৷ তার শৈশব-কৈশোর অন্য শিশুদের মতো ছিল না৷ আশেপাশের মানুষের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, হেনস্থার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছেন৷ সেই অতীত স্মৃতি বরাবরই তার জন্য যন্ত্রণাদায়ক৷ শিশির বলেন, একটা ছেলের শরীর নিয়ে কারো আচরণ যদি মেয়েলি হয়, তাহলে, ‘‘সেই আচরণে কেউ সমর্থন দেয় না, বরং অনবরত বুলিং, হেনস্থার শিকার হতে হয়, যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়৷ সেরকম প্রতিবন্ধকতা ভেদ করেই আজকের জায়গা তৈরি করতে হয়েছে৷’’

নুসরাত মৌ-এর সংগ্রামটা একটু অন্যরকম৷ ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও পড়াশোনা করতে পারেননি তিনি৷ চতুর্থ শ্রেণি পেরুতেই বাধ্য হয়েছেন স্কুল ছাড়তে৷ ‘‘আমি যখন স্কুলে যেতাম, তখন আমাকে অন্য শিক্ষার্থীরা খ্যাপাতো, হিজড়া হিজড়া বলতো, টিজ করতো, ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতো, এক সাথে বসতে গেলে বেঞ্চ ফেলে দিতো, নানাভাবে হেনস্থা করতো৷ এ কারণে স্কুলে যাওয়ার ম- মানসিকতাটা আর হয়নি৷ একটা পর্যায়ে মনে হলো, সবাই এমন অপমান করে, আর স্কুলেই যাবো না।

শুধু স্কুল নয়, পরিবারও ছাড়তে হয়েছে তাকে৷ মাত্র আট-নয় বছর বয়সেই চলে আসেন ট্রান্সজেন্ডার কমিউনিটিতে৷ উত্তরায় এক গুরু মায়ের কাছেই বড় হয়েছেন তিনি৷ ‘‘আমাদের সামাজিকভাবে স্বাভাবিক চোখে কেউ দেখে না৷ আমাদের মতো মানুষ এই পর্যায়ে আসতে পারে সেটিই কেউ ভাবতে পারে না৷’’ অবশ্য নুসরাত তার কমিউনিটির সদস্যদের কাছে কৃতজ্ঞ৷ তাদের সমর্থনই এতদূর আসার পেছনে তাকে উৎসাহ জুগিয়েছে৷

যেভাবে গণমাধ্যমে

টেলিভিশনের পর্দায় একই সময়ে অভিষেক হবে দুজনের, যদিও তাদের চলার পথটি ছিল একেবারেই ভিন্ন৷ তবে মিল এক জায়গায়৷ দুজনই বলছেন, তাদের কারো জন্যই এতদূর আসা হঠাৎ পাওয়া কোনো সুযোগ নয়৷

টেলিভিশনে সংবাদ পাঠিকা হতে চললেও শিশির চেয়েছিল নাটকে অভিনয় করতে৷ বৈশাখী টেলিভিশনে গিয়েছিলেন অডিশন দিতে৷

‘‘চয়নিকা দি (চয়নিকা চৌধুরী) একটি নাটকে কাজ করার জন্য কথা বলছিলেন৷ সেখান থেকে যখন কথাবার্তা হচ্ছিল, তখন ওনাদের নিউজে অডিশন দিতে বললেন৷ আমার উচ্চারণ ভালো দেখে বললেন নিউজে কাজ করতে চাই কিনা৷ আমারও ভালো লাগা ছিল, আগ্রহের জায়গা ছিল৷ সেখান থেকে অডিশন দিয়ে পুরো যোগ্যতা প্রমাণ করেই আমাকে আসতে হয়েছে, দীর্ঘ যাত্রা পেরিয়ে৷ যেহেতু আগের কোনো কোর্স করা নেই সেহেতু টেকনিক্যাল জায়গাগুলো বুঝতে হয়েছে।”

তবে এই বোঝাপড়ার জায়গায় সহকর্মীদের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছেন সেটি তার জন্যে অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা৷ ‘‘এটা আমার আরেকটা পরিবার, এখানে কেউ হয়রানি করে না৷ এখানে কেউ আমাকে আঙুল দিয়ে বলছে না আমি অন্য কেউ,” বলেন শিশির৷

গণমাধ্যমেই কাজ চালিয়ে যাবেন কিনা কিংবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী- এমন প্রশ্নে জানালেন, খুব বেশিদূর তাকাতে চান না তিনি৷ ‘‘আপাতত পড়োশোনা করছি, পোড়াশোনাটাই করতে চাই৷ ভবিষ্যৎ নিয়ে ঐ পরিমান ভাবতে পারিনি এখনও৷ পড়াশোনা শেষ করে হয়ত বুঝতে পারবো কী করা উচিত,’’ বলেন তিনি৷

নুসরাত মৌ অবশ্য গণমাধ্যমেই কাজ চালিয়ে যেতে চান৷ কেননা, শৈশব থেকে এমন স্বপ্নই দেখেছেন তিনি৷ শখ ছিল অভিনয়ের৷ সেই সুযোগ আসে আ ক ম নাসিরুল্লাহ নামে একজনের মাধ্যমে৷ তিনিই তাকে নিয়ে আসেন মঞ্চ নাটকে৷ ‘‘উনি আমাকে মেয়ের মতো দেখেন, ভালোবাসেন৷ উনি আমাকে মঞ্চ নাটকে নেন৷ সেখান থেকে আমার অভিনয় দেখে একজনের সঙ্গে পরিচয় হয়৷ তার মাধ্যমে মনির হোসেন জীবন ভাইয়েরসঙ্গে পরিচয় হয়৷ এভাবে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পরে আসলে এই কাজের সুযোগ পাওয়া,’’ বলেন মৌ৷

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের জন্য

ভবিষ্যৎ যেখানেই নিয়ে যাক না কেন দুইজনই তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য কাজ করতে চান৷ নুসরাতের ভাবনা নতুন প্রজন্মকে ঘিরে৷ ট্রান্সজেন্ডার হলেও তার মতো যেন কাউকে পড়াশোনা ছাড়তে না হয়৷ সবাই সমান ভাবে যাতে স্কুল কলেজে পড়ার অধিকার পায়৷ তার ভাবনা, ‘‘ভবিষ্যতেও তো হিজড়াদের জন্ম হবে৷ তারা কীভাবে বড় হবে? আমি চাই সরকার, সমাজ এমন কিছু একটা করুক যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পরিবারের সঙ্গে সুস্থ স্বাভাবিকভাবে পড়াশোনা করে বড় হতে পারে৷ আমাদের কমিউনিটিতে যেন তাদের আসতে না হয়৷’’

শিশিরের স্বপ্ন তৃতীয় লিঙ্গের কমিউনিটির সদস্যদের ভাগ্য পরিবর্তন করা৷ তাদের জন্য একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিত করা৷ ‘‘তাদের দক্ষতা উন্নয়নে এবং প্রতিটি মানুষকে সাপোর্ট দেওয়া দরকার৷ আমি শুরু থেকেই তাদের জন্য কাজ করেছি, সেটা সামনেও করবো৷ যে যেই সেক্টরে কাজ করতে চায় তাদের সহযোগিতা করবো,’’ এমনটাই শিশিরের সংকল্প৷

বৈশাখী টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ তাদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেছে, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ট্রান্সজেন্ডারদের ধারাবাহিক ও স্থায়ী উন্নয়নের ধারা নিশ্চিত করতে সবার মানসিকতার পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি৷ সে-কারণেই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে নারী দিবস উদযাপনের প্রাক্কালে তারা সংবাদে ও নাটকে দুইজন ট্রান্সজেন্ডার নারীকে যুক্ত করছেন৷

এদিন চ্যানেলটির ধারাবাহিক নাটক ‘চাপাবাজ’-এর একটি পর্বে দেখা যাবে নুসরাত মৌকে, যা প্রচারিত হবে রাত ৮টা ৪০ মিনিটে৷ অন্যদিকে শিশিরকে দেখা যাবে বৈশাখীর নিয়মিত সংবাদের উপস্থাপনায়৷ সৌজন্যে: ডয়চে ভেলে।